সম্পর্কে মনোমালিন্য হলে, সঙ্গীর কোনও আচরণে কষ্ট পেলে কিংবা দীর্ঘদিনের অশান্তিতে ক্লান্ত হয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন আসে—‘এই সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে গেলে কেমন হয়?’
সাধারণভাবে এমন চিন্তাকে সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া বা অঙ্গীকারের ঘাটতির লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু নতুন একটি গবেষণা বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। কখনো কখনো সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার কথা ভাবা ভালোবাসা বা টান কমে যাওয়ার ইঙ্গিত নয়; বরং সম্পর্কের মধ্যে আটকে পড়ার অনুভূতির প্রকাশও হতে পারে।
ছাড়তে চাই না, নাকি ছাড়তে পারছি না?
দুটি অবস্থার মধ্যে পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।
কেউ যদি বলেন, ‘আমি এই সম্পর্ক ছাড়তে চাই না’, তাহলে সেখানে ভালোবাসা, টান, দায়িত্ববোধ কিংবা একসঙ্গে ভবিষ্যৎ কাটানোর ইচ্ছা থাকতে পারে।
অপরদিকে, ‘আমি সম্পর্কটা ছাড়তে চাই, কিন্তু পারছি না’—এই অনুভূতির পেছনে থাকতে পারে ভয়, সামাজিক চাপ, আর্থিক নির্ভরশীলতা কিংবা সম্পর্ক থেকে বের হওয়ার পথ না পাওয়ার হতাশা।
আরও পড়ুন: বিচ্ছেদের পরও একই ছাদের নিচে? এমন জীবনে কী ঘটে
সম্পর্কবিষয়ক প্রচলিত ধারণায় দীর্ঘদিন ধরে মনে করা হয়েছে, কোনও সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হলে সেটি সম্পর্কের প্রতি গভীর অঙ্গীকারের ইঙ্গিত হতে পারে। কারণ দীর্ঘদিনের সম্পর্কে মানুষ শুধু একজন সঙ্গীর সঙ্গেই যুক্ত থাকেন না; বাসস্থান,
অর্থনীতি, পরিবার, বন্ধুত্ব ও সামাজিক পরিচয়ের মতো অনেক বিষয়ও একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
তবে নতুন গবেষণা বলছে, এই ব্যাখ্যা সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়।
সম্পর্কের স্থায়িত্ব মানেই সুস্থ সম্পর্ক নয়
একটি সম্পর্ক কত বছর টিকে আছে, সেটি দিয়ে সম্পর্কটি কতটা ভালো, তা সবসময় বোঝা যায় না।
দীর্ঘদিনের সম্পর্কেও কেউ যদি মনে করেন, নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তিনি সেখানে আটকে আছেন, তাহলে সেই সম্পর্কের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
অপরদিকে, কোনও সম্পর্কের মধ্যে সমস্যা থাকা সত্ত্বেও দুজন যদি নিজেদের সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলতে পারেন, একে অপরকে সম্মান করেন এবং সম্পর্কটি ধরে রাখার ইচ্ছা দুজনেরই থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আলাদা।
তাই সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু ‘থেকে যাওয়া’ নয়, ‘কেন থেকে যাওয়া হচ্ছে’—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পর্ক ছাড়ার কথা মাথায় আসা কি তাহলে ভালো?
একবার-দুবার সম্পর্ক ছেড়ে দেওয়ার কথা মনে হওয়া মানেই সম্পর্ক খারাপ—এমন নয়। আবার এমন চিন্তা হচ্ছে বলেই সম্পর্ক ভালো—এমনও নয়।
বরং এই চিন্তাটি কেন আসছে, সেটি বোঝা জরুরি।
সঙ্গীর সঙ্গে ঝামেলা হলে কি মনে হয়, কথা বলে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব? নাকি মনে হয়, যত চেষ্টাই করা হোক, কিছুই বদলাবে না?
সম্পর্কে মতবিরোধ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু সেখানে নিজের কথা বলার সুযোগ আছে কি না, সঙ্গী আপনার অনুভূতিকে গুরুত্ব দেন কি না এবং দুজন মিলে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন কি না—এসব বিষয় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
‘থাকতে চাই’ আর ‘থাকতেই হচ্ছে’ এক নয়
গবেষণা বলছে, একজন মানুষ কোনও সম্পর্কে আছেন, কারণ তিনি সেই সম্পর্ককে মূল্য দেন।
আরেকজন একই সম্পর্কে আছেন, কারণ তিনি মনে করছেন বের হওয়ার কোনও পথ নেই।
বাইরে থেকে দুটি সম্পর্ককেই সমানভাবে ‘দীর্ঘস্থায়ী’ মনে হতে পারে। কিন্তু ভেতরের মানসিক অভিজ্ঞতা এক নয়।
তাই সম্পর্কের মান বোঝার ক্ষেত্রে শুধু বিচ্ছেদের সম্ভাবনা কতটা, সেটি দেখলে চলবে না। দেখতে হবে, সম্পর্কের দুজন মানুষ সেখানে নিরাপদ, সম্মানিত এবং স্বেচ্ছায় যুক্ত বোধ করছেন কি না।
নিজের কাছে যে প্রশ্নটি করা যায়
সম্পর্ক নিয়ে দ্বিধা তৈরি হলে নিজেকে একটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—
‘আমি কি এই সম্পর্কে থাকতে চাই, নাকি শুধু সম্পর্কটি ছেড়ে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পাচ্ছি না?’
দুটি অবস্থার মধ্যে পার্থক্য অনেক বড়।
কারণ কোনও সম্পর্ক টিকে আছে কিনা, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—সেখানে থাকা মানুষটি সেই সম্পর্কে থাকতে চান কিনা।
