ক্রোমোজম শরীর নারী পুরুষ (1)

আমরা পৃথিবীকে সহজভাবে বুঝতে চাই। অনেক কিছুকেই দুই ভাগে ভাগ করে ফেলি—ভালো-মন্দ, দিন-রাত, সাদা-কালো। নারী-পুরুষের ক্ষেত্রেও আমাদের ধারণাটা অনেকটা এমনই।

কিন্তু মানুষের শরীরের গল্প কি সত্যিই এতটা সহজ?

জীববিজ্ঞান বলছে, সবসময় নয়।

মানুষের যৌন বৈশিষ্ট্য তৈরি হওয়ার পেছনে শুধু একটি বিষয় কাজ করে না। ক্রোমোজোম, জিন, হরমোন, যৌন অঙ্গের বিকাশ এবং শরীরের হরমোনের প্রতি প্রতিক্রিয়া—সবকিছু মিলেই তৈরি হয় একজন মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য। আর এসব প্রক্রিয়ায় ভিন্নতা থাকাও সম্ভব।

তাই প্রকৃতির হিসাব সবসময় শুধু ‘নারী’ আর ‘পুরুষ’—এই দুই বাক্সে আটকে থাকে না।

XX মানেই নারী, XY মানেই পুরুষ?

সাধারণভাবে মানুষের যৌন ক্রোমোজোমের ক্ষেত্রে XX-কে নারী এবং XY-কে পুরুষের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

এটা বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে ঠিকও।

কিন্তু এখানেই পুরো গল্প শেষ নয়।

কারণ শরীরের যৌন বৈশিষ্ট্য শুধু ক্রোমোজোমের ওপর নির্ভর করে না। কোন জিন কীভাবে কাজ করছে, শরীরে কোন হরমোন তৈরি হচ্ছে এবং সেই হরমোনের প্রতি শরীর কীভাবে সাড়া দিচ্ছে—এসবও গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে একই ধরনের ক্রোমোজোম থাকলেও দুজন মানুষের শরীরের বিকাশে পার্থক্য দেখা দিতে পারে।

ক্রোমোজোম এক, কিন্তু শরীরের বিকাশ আলাদা হতে পারে

এর একটি উদাহরণ অ্যান্ড্রোজেন ইনসেনসিটিভিটি সিনড্রোম বা এআইএস।

এ ক্ষেত্রে কারও XY ক্রোমোজোম থাকতে পারে। কিন্তু শরীর অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের প্রতি স্বাভাবিকভাবে সাড়া দিতে পারে না।

ফলে বাহ্যিকভাবে শরীরের যৌন বৈশিষ্ট্য পুরুষের মতো পুরোপুরি বিকশিত নাও হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে জন্মের সময় শিশুটিকে মেয়ের মতোই দেখা যায়।

কখনো আবার বিষয়টি বয়ঃসন্ধির আগে বোঝাই যায় না।

অর্থাৎ শুধু কারও ক্রোমোজোম দেখে তার শরীরের যৌন বিকাশের পুরো গল্পটা বলা সম্ভব নয়।

আবার XX হয়েও শরীরে দেখা দিতে পারে ভিন্নতা

বিষয়টি শুধু XY ক্রোমোজোমের ক্ষেত্রেই নয়।

কিছু ক্ষেত্রে XX ক্রোমোজোম থাকা ব্যক্তির শরীরেও অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে যৌন বৈশিষ্ট্যের বিকাশে ভিন্নতা দেখা দিতে পারে।

জন্মগত অ্যাড্রিনাল হাইপারপ্লাসিয়া বা সিএএইচ এমন একটি অবস্থার উদাহরণ।

অর্থাৎ শরীর কীভাবে নারী বা পুরুষের বৈশিষ্ট্য তৈরি করবে, সেটি এক লাইনের কোনো সূত্রে মেলে না।

ক্রোমোজোম গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একমাত্র বিষয় নয়।

তাহলে লিঙ্গপরিচয় কোথায়?

এখানে আরেকটি বিষয় আলাদা করে বোঝা দরকার।

কারও শরীরের জৈবিক যৌন বৈশিষ্ট্য আর তিনি নিজেকে কীভাবে পরিচয় দেন—দুটো একই বিষয় নয়।

জৈবিক যৌন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে ক্রোমোজোম, হরমোন, যৌন অঙ্গসহ শারীরিক বিষয়গুলো জড়িত।

অন্যদিকে লিঙ্গপরিচয় হলো একজন মানুষ নিজেকে কীভাবে অনুভব করেন এবং নিজের পরিচয়কে কীভাবে দেখেন।

তাই শরীরের বৈশিষ্ট্য আর একজন মানুষের নিজের পরিচয়কে এক করে দেখলে বিষয়টি অযথা জটিল হয়ে যায়।

প্রকৃতিও সবসময় দুই ভাগে চলে না

মজার বিষয় হলো, এই বৈচিত্র্য শুধু মানুষের মধ্যেই দেখা যায় না।  প্রাণিজগতেও যৌন বৈশিষ্ট্য তৈরির নানা রকম ব্যবস্থা রয়েছে।

কিছু কচ্ছপ, কুমির ও অ্যালিগেটরের ক্ষেত্রে ডিম ফোটার সময়কার তাপমাত্রা সন্তানের যৌন বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আবার কিছু মাছের শরীরে মানুষের মতো যৌন ক্রোমোজোম নেই। পরিবেশ ও শারীরবৃত্তীয় পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তাদের যৌন বৈশিষ্ট্য বদলাতেও পারে।

অর্থাৎ প্রকৃতি তার সব প্রাণীকে একই ছাঁচে তৈরি করে না।

আমরা সবকিছুকে দুই ভাগে দেখতে চাই কেন?

কারণ সহজ উত্তর আমাদের ভালো লাগে।

কোনো বিষয়কে দুই ভাগে ভাগ করলে সেটি মনে রাখা সহজ হয়। ‘এটা হয়, ওটা নয়’—এমন উত্তর পেলে আমাদের মনে হয় বিষয়টা বুঝে ফেলেছি।

কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় তার চেয়ে জটিল।

মানুষের শরীরও তেমন।

একজন মানুষের শরীরে ক্রোমোজোম এক ধরনের হতে পারে, কিন্তু হরমোনের কাজ বা শরীরের হরমোন গ্রহণের পদ্ধতিতে ভিন্নতা থাকতে পারে। আবার যৌন বৈশিষ্ট্যের বিকাশেও থাকতে পারে আলাদা রকমের ধরন।

তাই শুধু দুটি বাক্সে সবাইকে ঢোকাতে গেলে শরীরের অনেক বাস্তব বৈচিত্র্য চোখের আড়ালে চলে যায়।

‘স্বাভাবিক’ বলতে আমরা আসলে কী বুঝি?

এই প্রশ্নটাও গুরুত্বপূর্ণ।

মানুষের শরীরের ক্ষেত্রে ‘স্বাভাবিক’ বলতে আমরা সাধারণত যা বেশি দেখি, সেটাকেই বোঝাই। কিন্তু কোনো বৈশিষ্ট্য তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায় বলেই সেটি অস্তিত্বহীন বা অসম্ভব হয়ে যায় না।

মানুষের শরীরে নানা ধরনের জৈবিক ভিন্নতা আছে। উচ্চতা, চোখের রং, হরমোনের মাত্রা থেকে শুরু করে ক্রোমোজোমের বৈশিষ্ট্য—সবকিছুতেই বৈচিত্র্য দেখা যায়।

যৌন বৈশিষ্ট্যও তার বাইরে নয়।

বিজ্ঞান আসলে কী শেখায়?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়তো এটিই—প্রকৃতি সবসময় আমাদের বানানো নিয়ম মেনে চলে না।

নারী ও পুরুষ—এই দুটি শ্রেণি মানুষের জৈবিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এর পাশাপাশি যৌন বৈশিষ্ট্যের বিকাশে নানা ধরনের ভিন্নতাও রয়েছে।

তাই মানুষের শরীরকে বুঝতে গেলে শুধু ‘XX না XY?’—এই একটি প্রশ্ন যথেষ্ট নয়।

দেখতে হবে শরীরের জিন কীভাবে কাজ করছে, হরমোন কীভাবে কাজ করছে, শরীর সেই হরমোনে কীভাবে সাড়া দিচ্ছে এবং যৌন বৈশিষ্ট্য কীভাবে বিকশিত হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীর কোনো সাদা-কালো ছবির মতো নয়।

প্রকৃতির ছবিতে অনেক রং আছে। আর সেই বৈচিত্র্যই মানুষের শরীরকে এত জটিল, আবার এত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *