ভালোবাসা মানেই কি শুধু প্রেম? নাকি কখনও কখনও ভালোবাসা হয়ে ওঠে দায়িত্ব, ত্যাগ, কিংবা সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষের জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দেওয়ার নাম?
এমনই এক মানবিক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে চরকির নতুন ওয়েব ফিল্ম ‘লাইফলাইন’। নির্মাতা কাজী আসাদের এই চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিদ্যা সিনহা মিম। আর পুরো চলচ্চিত্রের আবেগ, সংকট ও মানবিকতার ভার অনেকটাই তার কাঁধে নির্ভর করেছে।
গল্পের কেন্দ্রে থাকা অনন্যা চরিত্রটি শুরুতে একজন সাধারণ শহুরে তরুণী বলেই মনে হয়। কিন্তু কাহিনি যত এগোয়, ততই স্পষ্ট হয় এটি শুধু একজন মেয়ের যাত্রার গল্প নয়; বরং মানুষ হয়ে ওঠার গল্প।
নির্মাতা কাজী আসাদের ভাষায়, ভালোবাসার টানে একজন মানুষ কতদূর যেতে পারে এবং সেই পথে কী কী হারানোর ঝুঁকি নিতে পারে, সেই প্রশ্ন থেকেই ‘লাইফলাইন’-এর জন্ম। সামাজিক সচেতনতা, আবেগ এবং মানবিক দায়বোধকে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা করেছেন তিনি।
চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক সম্ভবত এর মানবিক স্তরগুলো। বিশেষ করে আক্কাস আলী চরিত্রকে ঘিরে যে ট্র্যাজেডি নির্মিত হয়েছে, সেটি গল্পকে কেবল পারিবারিক আবেগের গণ্ডিতে আটকে রাখেনি। বরং মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতা, সহমর্মিতা এবং আত্মত্যাগের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
আক্কাস আলীর জীবনের বেদনাময় অতীত ও প্রতারিত হওয়ার ইতিহাস জানার পর অনন্যার প্রতিক্রিয়া গল্পে নতুন মাত্রা যোগ করে। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একজন অসহায় বাবার নিজের কন্যাসন্তানকে বাঁচানোর আকুতি দর্শককে আবেগপ্রবণ করে তোলে। আর সেই মুহূর্তে অনন্যার সিদ্ধান্ত তার চরিত্রকে সাধারণ নায়িকার জায়গা থেকে অনেক ওপরে তুলে নিয়ে যায়।
চলচ্চিত্রের শেষভাগে নিজের অসুস্থ বাবাকে কিডনি দান করা এবং পরবর্তীতে আক্কাস আলীর অনাথ কন্যাকে নিজের আশ্রয়ে নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে অনন্যা চরিত্রটি এক অনন্য মানবিক উচ্চতায় পৌঁছে যায়। এখানেই ‘লাইফলাইন’ শুধু ভালোবাসার গল্প থাকে না; হয়ে ওঠে দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার গল্প।
এই পুরো যাত্রায় বিদ্যা সিনহা মিমের অভিনয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি চিৎকার করে, নাটকীয় সংলাপ বলে নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে নীরবতা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংযত অভিব্যক্তির মাধ্যমে চরিত্রটির আবেগ প্রকাশ করেছেন। ফলে অনন্যার সংকট, দ্বিধা এবং মানবিক বোধ দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।
মিম নিজেও জানিয়েছেন, শুটিংয়ের সময় শারীরিক ক্লান্তি থাকলেও দৃশ্য ভালো হলে পুরো ইউনিট নতুন উদ্যমে কাজ করেছে। পর্দায় সেই আন্তরিকতার ছাপও স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
কোরবান চরিত্রে রিজওয়ান পারভেজও প্রশংসার দাবিদার। তার অভিনয় গল্পের আবেগকে আরও ঘন করেছে। পাশাপাশি গাজী রাকায়েত, আ খ ম হাসান, খায়রুল আলম সবুজ, নাজনীন হাসান চুমকি, আনিসা নূর আয়াত এবং ফাতেমাতুজ জোহরা ইভাসহ অন্য শিল্পীরাও নিজেদের চরিত্রের প্রতি সুবিচার করেছেন।
এর আগে চরকির জন্য আলোচিত সিরিজ ‘আধুনিক বাংলা হোটেল’ নির্মাণ করেছিলেন কাজী আসাদ। ‘লাইফলাইন’-এ তিনি ভিন্ন ধরনের গল্প বলার চেষ্টা করেছেন। এখানে বড় কোনও চমক নয়, বরং ছোট ছোট মানবিক মুহূর্তগুলোই গল্পের চালিকাশক্তি।
সব মিলিয়ে ‘লাইফলাইন’ এমন একটি ওয়েব ফিল্ম, যা শেষ হওয়ার পরও কিছু সময় দর্শকের ভেতরে থেকে যায়। কারণ এটি শুধু একটি গল্প বলে না, বরং মনে করিয়ে দেয়—রক্তের সম্পর্কের বাইরেও মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। আর কখনও কখনও সেই সম্পর্কই হয়ে উঠতে পারে জীবনের প্রকৃত লাইফলাইন।
