কৈশোরে মেয়েরা সাধারণত ঋতুচক্র, ডিম্বাণু, ভবিষ্যতে সন্তান ধারণের সক্ষমতা—এসব বিষয়ে নানা তথ্য জানতে শুরু করে। কিন্তু একই বয়সে ছেলেদের সঙ্গে যৌনতা নিয়ে কিছুটা আলোচনা হলেও, নিজের প্রজননক্ষমতা বা ভবিষ্যতে বাবা হওয়ার বিষয়টি নিয়ে খুব কমই কথা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই নীরবতার কারণেই অনেক পুরুষ নিজের প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে ভাবেন তখনই, যখন সন্তান নিতে গিয়ে কোনও সমস্যা ধরা পড়ে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে গবেষকেরা বলছেন, সমাজ দীর্ঘদিন ধরে ছেলেদের যৌনতা, পৌরুষ ও স্বাধীনতা নিয়ে নানা বার্তা দিলেও তাদের প্রজননক্ষমতা নিয়ে সচেতন হওয়ার সুযোগ খুব কম দিয়েছে।
যৌনতা শেখানো হয়, প্রজননস্বাস্থ্য নয়
গবেষকদের মতে, বেশিরভাগ ছেলে জানে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মাধ্যমে সন্তান জন্ম হয়। কিন্তু নিজের প্রজননক্ষমতা কীভাবে কাজ করে, বয়স, স্বাস্থ্য বা জীবনযাপনের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী—এসব বিষয়ে তাদের ধারণা খুবই সীমিত।
ফলে প্রজননস্বাস্থ্যকে তারা নিজের পরিচয়ের অংশ হিসেবে নয়, বরং সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের বিষয় হিসেবে দেখতে শেখে।
মেয়েদের সঙ্গে পার্থক্য কোথায়?
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক মেয়েই কৈশোর থেকেই শুনে বড় হয় যে নারীর প্রজননক্ষমতা বয়সের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় এবং ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সময়ের সম্পর্ক রয়েছে।
অন্যদিকে ছেলেদের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা গড়ে ওঠে—শুক্রাণু যেহেতু সারাজীবন উৎপন্ন হয়, তাই প্রজননক্ষমতা নিয়েও ভাবার প্রয়োজন নেই।
গবেষকদের মতে, এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। শুক্রাণু উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও বয়স, বিভিন্ন রোগ, ধূমপান, স্থূলতা, পরিবেশগত দূষণ এবং জীবনযাপনের নানা অভ্যাস পুরুষের প্রজননক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
সমস্যা ধরা পড়ে অনেক দেরিতে
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক পুরুষ কখনও নিজের প্রজননস্বাস্থ্য পরীক্ষা করান না। ফলে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনার সময় সমস্যা ধরা পড়লে সেটি তাদের জন্য মানসিকভাবে বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়ায়।
অনেকেরই তখন মনে হয়, এ বিষয়ে আগে কখনও ভাবার বা জানার সুযোগই পাননি।
কেন এই নীরবতা?
গবেষকদের মতে, সমাজে দীর্ঘদিন ধরে গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের বিষয়টিকে মূলত নারীর স্বাস্থ্য হিসেবে দেখা হয়েছে। ফলে মেয়েদের কৈশোর থেকেই প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে নিয়মিত আলোচনা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ তৈরি হলেও, ছেলেদের ক্ষেত্রে তেমন কোনও কাঠামো গড়ে ওঠেনি।
একইসঙ্গে পুরুষত্ব বা পৌরুষকে অনেক সময় যৌন সক্ষমতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলেও, প্রজননক্ষমতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা প্রায় অনুপস্থিত।
কী বলছেন গবেষকেরা?
গবেষকদের মতে, প্রজননস্বাস্থ্য শুধু নারীর নয়, পুরুষেরও বিষয়। তাই যৌনশিক্ষায় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ প্রতিরোধের পাশাপাশি ছেলে ও মেয়ে—উভয়ের ভবিষ্যৎ প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তাদের মতে, কৈশোর থেকেই ছেলেদের নিজের প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানানো, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপরীক্ষার সুযোগ তৈরি করা এবং এ বিষয়ে সামাজিক সংকোচ কমানো গেলে ভবিষ্যতে অনেক সমস্যা আগেই শনাক্ত ও মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
শেষ কথা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রজননক্ষমতা নিয়ে সচেতনতা মানে শুধু সন্তান নেওয়ার প্রস্তুতি নয়; বরং নিজের শরীর, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন হওয়া। আর সেই আলোচনায় ছেলেদেরও সমানভাবে অন্তর্ভুক্ত করার সময় এসেছে।
