রাস্তায় আহত একটি কুকুর দেখলেই মন খারাপ হয়ে যায়? অসহায় একটি বিড়াল বা পাখিকে দেখলে সাহায্য করতে ইচ্ছা করে? আবার অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রাণীরা যেন অচেনা হয়েও সহজেই কাছে চলে আসে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে থাকতে পারে মানুষের এক ধরনের বিশেষ সহমর্মিতার বৈশিষ্ট্য।
মনোবিজ্ঞানে এ ধরনের মানুষকে অনেক সময় ‘অ্যানিমেল এমপ্যাথ’ (Animal Empath) বলা হয়। অর্থাৎ, যারা প্রাণীদের অনুভূতি, ভয়, অস্বস্তি বা কষ্ট অন্যদের তুলনায় বেশি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। যদিও এটি এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মানসিক রোগনির্ণয় বা ক্লিনিক্যাল পরিচয় নয়, তবু মানুষ-প্রাণীর আবেগগত সম্পর্ক বোঝাতে ধারণাটি ক্রমেই আলোচনায় আসছে।
প্রাণীদের প্রতি এত টান কেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যাদের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য বেশি থাকে, তারা প্রাণীদের আচরণ খুব মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন এবং তাদের মানসিক অবস্থার প্রতি সহজেই সাড়া দেন। আহত বা অসহায় প্রাণী দেখলে তারা অন্যদের তুলনায় বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।
এমন মানুষদের অনেকেই প্রাণী উদ্ধারকাজ, আশ্রয়কেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবা, প্রাণী অধিকার আন্দোলন কিংবা পশুচিকিৎসার মতো পেশা বা কাজে যুক্ত হতে আগ্রহী হন। অনেকের জন্য প্রাণী নির্যাতনের ভিডিও বা সিনেমা দেখাও মানসিকভাবে কষ্টকর হয়ে ওঠে।
গবেষণা কী বলছে?
যুক্তরাষ্ট্রের পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, কাউকে যদি একজন অপরিচিত মানুষ ও একটি প্রাণীর মধ্যে একজনকে বেছে নিতে বলা হয়, তাহলে সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে পড়ে। আবার আলাদাভাবে বিচার করলে দেখা যায়, অনেক মানুষ অপরিচিত মানুষের তুলনায় প্রাণীর সঙ্গে আবেগগত সংযোগ গড়ে তুলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
গবেষকদের মতে, এটি মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে গড়ে ওঠা স্বাভাবিক আবেগগত বন্ধনেরই একটি ইঙ্গিত।
প্রাণীরাও কি মানুষের অনুভূতি বুঝতে পারে?
বিশেষ করে কুকুরের ওপর করা বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, তারা মানুষের মুখভঙ্গি, কণ্ঠস্বর এবং আচরণ দেখে অনেক সময় মালিকের আবেগ বুঝতে পারে। তাই আপনি দুঃখ পেলে বা অসুস্থ থাকলে পোষা কুকুরটি আপনার পাশে এসে বসতে পারে বা আগের চেয়ে বেশি সঙ্গ দিতে পারে।
তবে প্রাণীরা মানুষের মনের কথা বা চিন্তা সরাসরি বুঝতে পারে—এমন দাবির পক্ষে এখনো শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এটি মূলত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, আধ্যাত্মিক বিশ্বাস এবং বিভিন্ন সংস্কৃতিতে প্রচলিত ধারণার অংশ।
শুধু মায়া নয়, দরকার দায়িত্বও
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। আহত প্রাণীকে সহায়তা করা, নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, প্রয়োজন হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং তাদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
হয়তো সবাই ‘অ্যানিমেল এমপ্যাথ’ নন। তবে প্রাণীদের প্রতি সামান্য সহমর্মিতাও আমাদের সমাজকে আরও মানবিক করে তুলতে পারে। কারণ মানুষ যেমন ভালোবাসা বোঝে, প্রাণীরাও তেমনি যত্ন, নিরাপত্তা ও সদাচরণের প্রতিক্রিয়া দিতে জানে।
