‘তোমরা যদি ছোটবেলায় আমাকে বুঝতে, তাহলে আজ আমার এই অবস্থা হতো না।’

‘এত কষ্ট দিয়েছ, এখন আমার সব দায়িত্ব তোমাদের।’

‘তোমাদের ভুলের জন্যই আমি সফল হতে পারিনি।’

এমন অভিযোগ শুনতে হয় অনেক বাবা-মাকেই। অভিযোগের সঙ্গে কখনও যুক্ত হয় একের পর এক দাবি—আর্থিক সহায়তা, ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধান, সব সময় পাশে থাকা, এমনকি অসম্মানজনক আচরণও মেনে নেওয়ার প্রত্যাশা। ধীরে ধীরে অনেক বাবা-মা অপরাধবোধে ভুগতে শুরু করেন। মনে হয়, সত্যিই কি সন্তানের জীবনের সব ব্যর্থতার জন্য তারাই দায়ী?

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সন্তানের কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। তবে তার মানে এই নয় যে জীবনের সব দায় বাবা-মায়ের কাঁধে তুলে দিতে হবে। একটি সুস্থ সম্পর্কের জন্য যেমন সহমর্মিতা দরকার, তেমনি দরকার দায়িত্বের ভারসাম্যও।

কষ্টকে স্বীকার করুন, কিন্তু সব দোষ নিজের নয়

কোনো পরিবারই নিখুঁত নয়। বাবা-মাও ভুল করতে পারেন। কোনো সিদ্ধান্ত, আচরণ বা পরিস্থিতি সন্তানের মনে আঘাতের কারণ হতে পারে।

তাই সন্তানের অনুভূতিকে অস্বীকার না করে বলা যেতে পারে, ‘তোমার কষ্ট আমি বুঝতে পারছি। যদি আমার কোনো ভুল তোমাকে আঘাত দিয়ে থাকে, আমি সেটা শুনতে চাই।’

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সহমর্মিতা দেখানোর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি অভিযোগ সত্য বলে মেনে নিতে হবে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বর্তমান জীবনের প্রতিটি সমস্যার জন্য অতীতের সব দায় বাবা-মায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়াও বাস্তবসম্মত নয়।

সাহায্য আর ‘উদ্ধার’ এক জিনিস নয়

অনেক বাবা-মা অপরাধবোধ থেকে সন্তানের প্রতিটি সমস্যা নিজেরাই সমাধান করতে চান। বারবার টাকা দেন, ঋণ শোধ করেন, চাকরি খুঁজে দেন বা প্রতিটি সংকটে ছুটে যান।

কিন্তু মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের সহায়তা অনেক সময় সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে সন্তানের নিজের দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ সাহায্য করতে গিয়ে অজান্তেই তাকে আরও নির্ভরশীল করে তোলা হতে পারে।

অপরাধবোধ নয়, দরকার সীমারেখা

যখন প্রতিটি কথোপকথন অভিযোগে গিয়ে শেষ হয়, তখন অনেক বাবা-মা ঝগড়া এড়াতে নীরব থাকেন। কেউ কেউ আবার সম্পর্ক বাঁচাতে সব দাবিই মেনে নেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ সম্পর্কের জন্য স্পষ্ট ও শান্ত সীমারেখা (বাউন্ডারি) জরুরি। সীমারেখা মানে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়; বরং সম্মান বজায় রেখে কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য আর কোনটি নয়, তা পরিষ্কার করে দেওয়া।

কেন অভিযোগের চক্র থামে না?

দীর্ঘদিন ধরে যদি একটি পরিবার শুধু একজন সদস্যের কষ্টকে কেন্দ্র করেই চলতে থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে পুরো পরিবার সেই সংকটের চারপাশে আবর্তিত হতে শুরু করে।

এর ফলে বাবা-মা ক্রমাগত অপরাধবোধে ভোগেন, আর সন্তানও অনেক সময় অতীতের ব্যাখ্যাতেই আটকে থাকে। বর্তমানের দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ বা প্রয়োজনীয়তা দুটোই কমে যায়। এতে সম্পর্কের টানাপোড়েন কমার বদলে আরও বাড়তে পারে।

বাবা-মা কী করতে পারেন?

বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন—

  • সন্তানের অনুভূতি মনোযোগ দিয়ে শুনুন, কিন্তু নিজের আত্মসম্মান বা মানসিক সুস্থতাকে বিসর্জন দেবেন না।
  • প্রয়োজনে নিজের ভুল স্বীকার করুন, তবে অযৌক্তিক সব অভিযোগের দায় নিজের ওপর নেবেন না।
  • সাহায্য করুন, কিন্তু এমনভাবে নয় যাতে সন্তানের নিজের দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ নষ্ট হয়।
  • অপরাধবোধের বশে নয়, শান্ত ও বিবেচনাপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিন।
  • সম্পর্ক বারবার তীব্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে পারিবারিক কাউন্সেলিং বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে পারেন।

শেষ কথা

সন্তানের কষ্ট বাস্তব হতে পারে। বাবা-মায়ের ভুলও থাকতে পারে। কিন্তু একটি সুস্থ সম্পর্ক শুধু অতীতের ভুল খুঁজে বের করার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং বর্তমানের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার ওপরও নির্ভর করে।

সহমর্মিতা, সম্মান এবং সুস্থ সীমারেখা—এই তিনটির সমন্বয়ই বাবা-মা ও প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের সম্পর্ককে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করতে পারে। কারণ ভালোবাসা মানে সব দোষ নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া নয়; ভালোবাসা মানে কখন পাশে দাঁড়াতে হবে, আর কখন প্রিয় মানুষটিকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিতে হবে—সেই ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *