Young Couple Parshwachitra তরুণ তরুণী (1)সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তরুণদের একটি বড় অংশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যাচ্ছে (প্রতীকী ছবি/পিক্সাবে)

ভালোবাসার মানুষ খুঁজে পাওয়া যেন আগের চেয়ে সহজ। হাতের মুঠোয় ডেটিং অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও কল—সবই আছে। তবু গবেষণা বলছে, অনেক তরুণ আগের তুলনায় কম যৌন সম্পর্কে জড়াচ্ছেন। শুধু তাই নয়, অনেকেই সম্পর্ক গড়ার উদ্যোগই নিচ্ছেন না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে কারণ শুধু ইচ্ছার অভাব নয়। বদলে যাওয়া সামাজিক বাস্তবতা, প্রযুক্তিনির্ভর জীবন, একাকীত্ব, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় এবং ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রতি বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক নতুন সংকট।

সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত এক দশকে তরুণদের মধ্যে যৌন সম্পর্কের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

কী বলছে গবেষণা?

জামা নেটওয়ার্ক ওপেন-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০০২ সালে ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী পুরুষদের ১৯ শতাংশ জানিয়েছিলেন, গত এক বছরে তারা কোনও যৌন সম্পর্কে জড়াননি। ২০১৮ সালে সেই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩১ শতাংশে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ সালে ২২ থেকে ৩৪ বছর বয়সী পুরুষদের ২৪ শতাংশ জানিয়েছেন, গত এক বছরে তারা যৌন সম্পর্কে জড়াননি। এক দশক আগে এই হার ছিল মাত্র ৯ শতাংশ।

অর্থাৎ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তরুণদের একটি বড় অংশ যৌন ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

সম্পর্ক আছে, কিন্তু নাম নেই

বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের অনেক তরুণ-তরুণী সম্পর্ককে আগের মতো স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করেন না।

‘প্রেম করছি’ বলার বদলে অনেকেই বলেন, ‘একসঙ্গে সময় কাটাচ্ছি’।

এই অনিশ্চয়তা সম্পর্কের নিরাপত্তাবোধ কমিয়ে দেয়। ফলে অনেকেই গভীর আবেগের সম্পর্কে জড়ানোর বদলে দূরত্ব বজায় রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

প্রযুক্তি কি মানুষকে আরও একা করে দিচ্ছে?

মনোবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, স্মার্টফোন মানুষের বিনোদন, যৌনতা, সামাজিক যোগাযোগ—সবকিছুর বিকল্প হয়ে উঠেছে।

বাড়ি থেকে বের না হয়েও ভিডিও, গেম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা পর্নোগ্রাফিতে সময় কাটানো সম্ভব হচ্ছে। ফলে বাস্তব সম্পর্ক গড়ার প্রয়োজনীয়তা বা আগ্রহ অনেকের ক্ষেত্রেই কমে যাচ্ছে।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক জরিপে ৪৮০টি ক্যাম্পাসের ১০ হাজার শিক্ষার্থীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী যৌন সম্পর্কের সময়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেছেন অথবা বার্তা আদান-প্রদান করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু মনোযোগের বিচ্যুতি নয়; বরং ঘনিষ্ঠতার অভিজ্ঞতাও প্রযুক্তি কীভাবে বদলে দিচ্ছে, তার একটি ইঙ্গিত।

ভয়ও বড় কারণ

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে সম্পর্ক গড়তে গিয়ে অনেক তরুণ ভুল বোঝাবুঝি, প্রত্যাখ্যান বা যৌন অসদাচরণের অভিযোগে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায়ও এগোতে চান না। ফলে অনেকেই সম্পর্ক শুরু করার আগেই নিজেকে গুটিয়ে নেন।

একাকীত্বের নতুন চেহারা

গবেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য হতে পারে একাকীত্ব।

কারণ যৌনতা শুধু শারীরিক চাহিদা নয়, এটি অনেকের জন্য আবেগ, বিশ্বাস, নিরাপত্তা এবং ঘনিষ্ঠতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষ যত বেশি বাস্তব সম্পর্ক এড়িয়ে শুধু ভার্চুয়াল জগতে নির্ভরশীল হবে, ততই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়তে পারে।

শেষ কথা

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাটি যৌনতার পরিমাণ কমে যাওয়ায় নয়; বরং মানুষ ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার সাহস হারিয়ে ফেলছে কিনা, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু সম্পর্কের জায়গায় যদি বাস্তব সংযোগের বদলে ভার্চুয়াল উপস্থিতি জায়গা দখল করে নেয়, তাহলে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সংকট হতে পারে নিঃসঙ্গতা। কারণ মানুষের সবচেয়ে গভীর চাহিদাগুলোর একটি এখনও একই রয়ে গেছে—কাউকে সত্যিকারের কাছে পাওয়া, আর কারও কাছে সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *