সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোন দেখা, কাজের ফাঁকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুঁ মারা, রাতে ঘুমানোর আগে আরও কিছুক্ষণ অনলাইনে থাকা—এসব এখন এতটাই স্বাভাবিক যে অনেক সময় খেয়ালই থাকে না, আমরা আসলে কতটা সময় অনলাইনে কাটাচ্ছি।
কিন্তু অনলাইনে থাকার বিষয়টি শুধু কত ঘণ্টা ফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছি, তা দিয়ে বোঝা যায় না। বরং আশপাশের মানুষ কতটা অনলাইনে থাকে, সেটিও আমাদের আচরণ এবং ভালো থাকার অনুভূতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্প্রতি প্রকাশিত একটি মনোবিষয়ক বিশ্লেষণে ২০২৬ সালের বিশ্ব সুখ প্রতিবেদন ও সাম্প্রতিক গবেষণার আলোকে বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মানুষ নিজের অনলাইন আচরণ অনেক সময় আশপাশের মানুষের আচরণের সঙ্গে মিলিয়ে নেয়।
সবাই করছে, তাই আমিও করছি
ধরা যাক, আপনার বন্ধুদের প্রায় সবাই সারাক্ষণ অনলাইনে থাকে। কেউ নিয়মিত পোস্ট করছেন, কেউ মুহূর্তে মুহূর্তে বার্তার উত্তর দিচ্ছেন, কেউ আবার দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়।
তখন নিজের কম অনলাইনে থাকাটাকেই অস্বাভাবিক মনে হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রবণতাকে অন্যদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা বলা যায়। অর্থাৎ আশপাশের মানুষ যতটা অনলাইনে থাকে, সেটিকেই নিজের জন্য এক ধরনের স্বাভাবিক মাত্রা হিসেবে ধরে নেওয়া।
আরও পড়ুন: কাউকে পাওয়ার চেয়ে অপেক্ষাটাই বেশি সুন্দর? প্রেমে নতুন ট্রেন্ড ‘ইয়ার্নিং’
২০২৪ সালের একটি গবেষণাতেও কিশোরদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তারা সমবয়সীদের অনলাইন আচরণকে কীভাবে দেখছে, তার সঙ্গে নিজেদের পোস্ট করা, প্রতিক্রিয়া জানানো এবং অনলাইনে থাকার মাত্রার সম্পর্ক রয়েছে।
অর্থাৎ ফোন হাতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সবসময় একেবারে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়। আমাদের সামাজিক পরিবেশও নীরবে সেই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
একই এক ঘণ্টা, কিন্তু ফল এক নয়
এখানেই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
অনলাইনে কাটানো এক ঘণ্টা একজনের জন্য ক্ষতিকর নাও হতে পারে, আবার অন্যজনের ক্ষেত্রে তা ভালো থাকার অনুভূতির সঙ্গে নেতিবাচকভাবে সম্পর্কিত হতে পারে।
এর পেছনে আশপাশের মানুষের অনলাইন ব্যবহারের মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশ্ব সুখ প্রতিবেদনের আলোচনায় দেখা গেছে, কোনো সামাজিক গোষ্ঠীতে অনলাইন ব্যবহার তুলনামূলক কম থাকলে বেশি সময় অনলাইনে থাকা কখনও কখনও সামান্য ভালো থাকার অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কিন্তু সেই গোষ্ঠীতে যখন অতিরিক্ত অনলাইন ব্যবহার প্রায় সবার স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন বেশি ব্যবহারের সঙ্গে কম ভালো থাকার সম্পর্ক দেখা যায়।
তাই শুধু ‘ফোন কম ব্যবহার করুন’ বললেই পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায় না।
তরুণদের ওপর প্রভাব বেশি কেন?
তরুণদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল হতে পারে। কারণ অনেক তরুণের সামাজিক পরিবেশই এখন প্রায় পুরোপুরি ডিজিটাল।
বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ, বিনোদন, পড়াশোনা, কাজ—সবকিছুর সঙ্গেই অনলাইন জীবন জড়িয়ে গেছে।
ফলে আশপাশে এমন মানুষ কম পাওয়া যায়, যারা খুব কম অনলাইনে থাকে। অর্থাৎ তুলনা করার জন্য একটি ‘কম অনলাইন’ জীবন চোখের সামনে থাকে না।
এই পরিস্থিতিতে বেশি সময় অনলাইনে থাকাটাও অস্বাভাবিক মনে হয় না। বরং কম ব্যবহার করলেই মনে হতে পারে, ‘আমি কি কিছু মিস করছি?’
শুধু নিজের ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর করলেই হবে?
এখানেই বিষয়টির গুরুত্বপূর্ণ দিকটি সামনে আসে।
অনলাইনে ব্যবহার কমানোর ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ বা ইচ্ছাশক্তির কথা ভাবি। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মানুষ কীভাবে অনলাইনে আচরণ করবে, তার ওপর অন্যরা কী করছে বলে আমরা মনে করি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থাৎ আপনি নিজে ফোন কম ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিলেও, আপনার চারপাশের সবাই যদি সারাক্ষণ অনলাইনে থাকে, তাহলে সেই অভ্যাস থেকে বের হওয়া কঠিন হতে পারে।
কারণ তখন কম অনলাইনে থাকাটাই আপনার কাছে ব্যতিক্রমী আচরণ বলে মনে হতে পারে।
শুধু সুখ নয়, সামাজিক সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে
বিষয়টি কেবল মন-মেজাজে আটকে নেই।
একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি অনলাইন ব্যবহারে পরিপূর্ণ সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে আন্তব্যক্তিক আস্থা কমে যাওয়া এবং সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন বোধ করার সম্পর্কও পাওয়া গেছে। নিজের সামাজিক জীবনকে অন্যদের তুলনায় কম ভালো মনে করার প্রবণতাও দেখা গেছে—যদিও বাস্তবে সরাসরি সামাজিক যোগাযোগের পরিমাণ ততটা বদলায়নি।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সমস্যা কখনও কখনও বাস্তব জীবনে কী ঘটছে তার চেয়ে, আমরা নিজের জীবনকে অন্যদের জীবনের সঙ্গে কীভাবে তুলনা করছি, তার মধ্যেও তৈরি হতে পারে।
তাহলে কী করবেন?
সমাধান হিসেবে একেবারে ফোন ছুড়ে ফেলে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে না। বরং নিজের সামাজিক পরিবেশটাও খেয়াল করার পরামর্শ পাওয়া যায়।
আপনার বন্ধু বা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কি সবাই সারাক্ষণ অনলাইনে? অনলাইনে থাকা কি আপনাদের কাছে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে অফলাইনে থাকাকে অস্বাভাবিক মনে হয়?
যদি এমন হয়, তাহলে নিজের ব্যবহারের পাশাপাশি কাদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন এবং সেই পরিবেশ আপনার অনলাইন অভ্যাসকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, সেটিও ভাবা যেতে পারে।
পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে ফোনমুক্ত সময় নির্ধারণ করা, একসঙ্গে বাইরে হাঁটতে যাওয়া, সরাসরি আড্ডা দেওয়া কিংবা এমন সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সারাক্ষণ অনলাইনে থাকার চাপ নেই—এসব ছোট পরিবর্তন কাজে আসতে পারে
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু ‘আমি দিনে কত ঘণ্টা ফোন ব্যবহার করছি?’—এমন নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে—‘আমি যাদের সঙ্গে থাকি, তাদের অনলাইন অভ্যাস কি আমার কাছেও এই ব্যবহারকে স্বাভাবিক করে তুলছে?’
কারণ ফোনের দিকে বারবার তাকানোর অভ্যাস হয়তো শুধু আপনার নিজের অভ্যাস নয়। আপনার চারপাশের মানুষজনও অজান্তেই সেই অভ্যাসের অংশ হয়ে থাকতে পারেন।