একজনকে ভালোবাসলে কি আর কাউকে ভালোবাসা যায় না? প্রেম মানেই কি একজন মানুষ, একটি হৃদয় আর একটি ভালোবাসা? নাকি মানুষের হৃদয় এতটাই বিস্তৃত যে সেখানে একাধিক মানুষের জন্যও আলাদা জায়গা তৈরি হতে পারে?
প্রশ্নটি নতুন নয়। সাহিত্য, সিনেমা থেকে শুরু করে বাস্তব জীবন—বারবারই এই বিতর্ক ফিরে এসেছে। অনেকের বিশ্বাস, একজনকে সত্যিকারের ভালোবাসলে অন্য কারও জন্য হৃদয়ে আর জায়গা থাকে না। তবে মনোবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক কিছু গবেষণা বলছে, বিষয়টি এতটা সাদাকালো নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালোবাসার ক্ষমতা (capacity to love) আর একটি সম্পর্ক ধরে রাখার বাস্তব সামর্থ্য (relational resources) এক জিনিস নয়। একজন মানুষ একাধিক মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা অনুভব করতে পারেন। কিন্তু সময়, মনোযোগ, মানসিক শক্তি, শারীরিক উপস্থিতি ও প্রতিশ্রুতির মতো বাস্তব সম্পদ সীমিত। তাই ভালোবাসার অনুভূতি আর সম্পর্ক পরিচালনার সক্ষমতাকে এক করে দেখা ঠিক নয়।
হৃদয়ের জায়গা কি সত্যিই ফুরিয়ে যায়?
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের ভালোবাসার ক্ষমতা অনেকটাই নমনীয়। একজন বাবা-মা যেমন একাধিক সন্তানকে সমান ভালোবাসতে পারেন, তেমনি মানুষের আবেগও সবসময় নির্দিষ্ট সীমায় আটকে থাকে না।
অবশ্য রোমান্টিক সম্পর্ক পারিবারিক সম্পর্কের মতো নয়। তবু এই উদাহরণটি দেখায়, ভালোবাসা সবসময় ভাগ হয়ে ছোট হয়ে যায়—এমন ধারণা সব ক্ষেত্রে সত্য নয়।
আরও পড়ুন: ভালোবাসার মানুষ আছে, তবু অন্য কাউকে ভালো লাগে কেন?
আরেকটি উদাহরণ দেন গবেষকেরা। অনেক বিধবা বা বিপত্নীক ব্যক্তি জীবনের কোনো এক পর্যায়ে আবার প্রেমে পড়েন। কিন্তু নতুন সম্পর্কে জড়ানোর পরও তারা বলেন, প্রয়াত জীবনসঙ্গীর প্রতি ভালোবাসা তাদের হৃদয়ে রয়ে গেছে। অর্থাৎ নতুন ভালোবাসা পুরোনো ভালোবাসাকে মুছে দেয় না; বরং হৃদয়ে নতুন আরেকটি জায়গা তৈরি হয়।
সীমাবদ্ধতা কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, আসল সীমাবদ্ধতা হৃদয়ে নয়, বাস্তব জীবনে। একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সময়, মনোযোগ, যত্ন, মানসিক শক্তি, শারীরিক উপস্থিতি এবং প্রতিশ্রুতি। এগুলোর প্রতিটিই সীমিত। সবার দিনেই ২৪ ঘণ্টা। ফলে একজনের প্রতি যত বেশি সময় ও মনোযোগ দেওয়া হবে, অন্য সম্পর্কের জন্য তত কম সময় অবশিষ্ট থাকবে।
অর্থাৎ সীমাবদ্ধ হয় সম্পর্ক পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ, ভালোবাসার অনুভূতি নয়।
ভালোবাসা মানুষকে কীভাবে বদলে দেয়?
মনোবিজ্ঞানের ‘ব্রডেন অ্যান্ড বিল্ড’ তত্ত্ব বলছে, ভালোবাসা, আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার মতো ইতিবাচক আবেগ মানুষের চিন্তার পরিসর প্রসারিত করে। সময়ের সঙ্গে এগুলো মানসিক শক্তি, স্থিতিস্থাপকতা এবং সুস্থতা গড়ে তুলতেও সহায়তা করে।
অন্যদিকে ‘সেলফ-এক্সপ্যানশন থিওরি’ অনুযায়ী, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মানুষকে নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং নতুন পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে। অর্থাৎ ভালোবাসা শুধু অন্য একজন মানুষকে পাওয়ার অনুভূতি নয়, এটি নিজের ভেতরেও এক ধরনের বিস্তার ঘটায়।
ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের আরেকটি দিক
গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তোষজনক দাম্পত্য বা যৌনজীবনের পর যে ইতিবাচক আবেগ তৈরি হয়, তা অনেক ক্ষেত্রে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। গবেষকেরা একে ‘সেক্সুয়াল আফটারগ্লো’ বলে থাকেন।
এই ইতিবাচক অনুভূতি সম্পর্কের সন্তুষ্টি, পারস্পরিক আন্তরিকতা ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ সুখকর অভিজ্ঞতা আবেগকে নিঃশেষ করে না; বরং অনেক সময় আরও সমৃদ্ধ করে।
শেষ কথা
মনোবিজ্ঞান বলছে, ভালোবাসাকে নির্দিষ্ট আকারের একটি কেকের সঙ্গে তুলনা করা ঠিক নয়। একজনকে ভালোবাসলে অন্যজনের জন্য ভালোবাসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যায়—এমন কোনো সার্বজনীন নিয়ম নেই।
তবে সুস্থ সম্পর্ক কেবল ভালোবাসার অনুভূতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সময়, দায়িত্ব, সম্মান, উপস্থিতি ও প্রতিশ্রুতি—যেগুলো সীমিত।
তাই একজনকে ভালোবাসার পর আরেকজনকে ভালোবাসা সম্ভব কি না—এই প্রশ্নের উত্তর শুধু হৃদয়ে নয়, সম্পর্কের বাস্তবতাতেও লুকিয়ে আছে।
হয়তো এ কারণেই বলা যায়, হৃদয় অনেক সময় প্রসারিত হতে পারে, কিন্তু ক্যালেন্ডার নয়। ভালোবাসার ক্ষমতা বাড়তে পারে, কিন্তু সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে যে সময়, যত্ন ও দায়বদ্ধতা প্রয়োজন, তার বিকল্প নেই।
