অনেকেই মনে করেন, সত্যিকারের প্রেমে পড়লে অন্য কাউকে আর ভালো লাগার কথা নয়। সম্পর্কে থেকেও যদি অন্য কারও প্রতি আকর্ষণ অনুভব হয়, তাহলে বুঝি সম্পর্কে ফাটল ধরেছে।
কিন্তু মনোবিজ্ঞান বলছে, বাস্তবতা এতটা সরল নয়। গভীর প্রেমে থাকা মানুষেরও কখনও কখনও অন্য কারও প্রতি আকর্ষণ জন্মাতে পারে। তবে সেই আকর্ষণ আর বিশ্বাসঘাতকতা এক বিষয় নয়। অনুভূতি ও আচরণের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রেমের বিপরীত আসলে অন্য কারও প্রতি আকর্ষণ নয়; বরং উদাসীনতা। অর্থাৎ, অন্য কাউকে আকর্ষণীয় মনে হওয়া স্বাভাবিক মানবিক অভিজ্ঞতা হতে পারে। কিন্তু সেই অনুভূতির ভিত্তিতে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, সেটিই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
আকর্ষণ কেন তৈরি হয়?
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের আবেগ মূলত নতুনত্ব, পরিবর্তন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনও ঘটনার প্রতি সাড়া দেয়। নতুন কোনও মানুষ, নতুন আচরণ বা নতুন অভিজ্ঞতা স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে।
এই কারণেই সুখী সম্পর্কে থাকা মানুষও কখনও অন্য কাউকে সুন্দর, বুদ্ধিমান বা আকর্ষণীয় মনে করতে পারেন। এর অর্থ এই নয় যে তিনি নিজের সঙ্গীকে আর ভালোবাসেন না।
গবেষকেরা বলছেন, আকর্ষণকে বিশ্বাসঘাতকতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়। যেমন রাগ অনুভব করা আর আক্রমণাত্মক আচরণ করা এক বিষয় নয়, তেমনি অন্য কারও প্রতি আকর্ষণ অনুভব করা আর সম্পর্কের বাইরে গিয়ে কিছু করা এক বিষয় নয়।
আকর্ষণেরও আছে দুই রূপ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আকর্ষণ সাধারণত দুই ধরনের হতে পারে। একটি শারীরিক আকর্ষণ, যেখানে নতুন কারও প্রতি যৌন বা বাহ্যিক আকর্ষণ তৈরি হয়। অন্যটি আবেগগত আকর্ষণ। অর্থাৎ, এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া, যার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে, নিজেকে বেশি বোঝা হয়েছে বলে মনে হয় বা মানসিকভাবে কাছের মানুষ বলে অনুভূত হয়।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই ধরনের আবেগগত ঘনিষ্ঠতার সুযোগ আগের তুলনায় অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।
সফল সম্পর্কের রহস্য কোথায়?
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের সাফল্য শুধু আত্মসংযমের ওপর নির্ভর করে না। বরং প্রলোভন তৈরি হতে পারে—এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলার অভ্যাস আরও কার্যকর।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ বেশি, তারা সাধারণত এমন পরিবেশ বা সম্পর্ক থেকে দূরে থাকেন, যেখানে অপ্রয়োজনীয় আবেগগত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে তাদের পরে গিয়ে নিজেকে দমন করার প্রয়োজনও কম হয়।
এ ছাড়া সুখী দম্পতিরা সচেতন বা অবচেতনভাবে নিজের সম্পর্কে আরও বেশি বিনিয়োগ করেন। তারা বিকল্প কাউকে অতিরিক্ত গুরুত্ব না দিয়ে বর্তমান সম্পর্ককে মূল্য দেন এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য, পরিবার ও ভবিষ্যতের কথা বেশি ভাবেন।
তাহলে কি আকর্ষণ মানেই সম্পর্কে সমস্যা?
বিশেষজ্ঞদের উত্তর—না। গভীর ও সুখী সম্পর্কেও অন্য কারও প্রতি সাময়িক আকর্ষণ তৈরি হতে পারে। তবে সেটি সম্পর্কের মান নির্ধারণ করে না। সম্পর্কের আসল শক্তি বোঝা যায়, মানুষটি শেষ পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তার ওপর।
বিশ্বাস, দায়বদ্ধতা এবং সচেতন সিদ্ধান্তই দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ভিত্তি।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ভালোবাসা মানে জীবনে আর কোনও সম্ভাবনা চোখে না পড়া নয়। বরং বহু সম্ভাবনার মাঝেও প্রতিদিন একই মানুষকে বেছে নেওয়ার নামই ভালোবাসা।
তাই প্রেমের সবচেয়ে বড় শত্রু অন্য কারও প্রতি ক্ষণিকের আকর্ষণ নয়। সবচেয়ে বড় শত্রু হলো—উদাসীনতা, যখন সম্পর্কটিই আর মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ থাকে না।
/এম/
